বই রিভিউ | পানিঝোরা কটেজ – পত্রভারতী

উপন্যাস – পানিঝোরা কটেজ, লেখক – ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়, সৈকত মুখোপাধ্যায়, জয়দীপ চক্রবর্তী, জয়ন্ত দে, রাজা ভট্টাচার্য, চুমকি চট্টোপাধ্যায়, বিনোদ ঘোষাল, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, অভীক মুখোপাধ্যায়, মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য, সাগরিকা রায়, দীপান্বিতা রায়, অভীক সরকার, দেবারতি মুখোপাধ্যায়, অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী, হিমাদ্রীকিশোর দাশগুপ্ত; প্রকাশক – পত্রভারতী

পানিঝোরা কটেজ – হল বাংলা সাহিত্যে একটি বিরল প্রচেষ্টার অন্যতম। একটিই উপন্যাস, লিখেছেন ১৬ জন লেখক, ১৬ টি অধ্যায়ে। দুই বন্ধু ঘুরতে যায় বক্সা ফোর্টে। সেখানেই খুব সুন্দর একটি পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত একটি কটেজে থাকার পরিকল্পনা করে তারা, এবং সেইমত থাকতেও শুরু করে। পান্ডববর্জিত জায়গা, স্থানীয় লোক বা একজন কেয়ারটেকারেরও দেখা নেই। শুধু মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যায় একটা রহস্যময় ছেলেকে। কে ও, কোত্থেকে আসে – জানা নেই। শুরু থেকেই দুই বন্ধুর এই কটেজে থাকা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, বিভিন্ন উল্টোপাল্টা দৃশ্য হটাৎ করেই তাদের সামনে ভেসে উঠতে থাকে, যেসব দৃশ্যের সাথে এখনকার যুগের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে এসবের মানেটাই বা কী? সেই মানে খোঁজা নিয়ে এই উপন্যাস। এবার আসি লেখার আলোচনায় –

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় শুরুটা ভালোই করেছেন। দুই বন্ধুর একসাথে ঘুরতে যাওয়া এবং একটু ইতিহাসের খোঁচা সমেত তার অংশ বেশ মজাদার। সৈকত মুখোপাধ্যায় ভালো ধরেছেন ত্রিদিব বাবুর শেষের পর থেকে। তাঁর শেষাংশটাও বেশ চমকপ্রদ। জয়দীপ চক্রবর্তী-র অংশে তেমন বিশেষ কিছু নেই, কয়েক জায়গার লেখা আমার কাছে বালখিল্য ধরণের মনে হয়েছে। জয়ন্ত দে তাঁর অংশে আগের পার্টটা অনেকটাই মেকআপ করেছেন। রাজা ভট্টাচার্য এবং চুমকি চট্টোপাধ্যায় নিজের অংশটুকু মোটামুটি ভালো লিখেছেন। বিনোদ ঘোষাল-এর অংশটা আমার খুব ভালো লেগেছে, গল্পের আসল বেগ এখান থেকেই শুরু হয়েছে। দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য – দুর্দান্ত, সুন্দর ও উত্তেজনাময় ভাবে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রী-ইন্ডিপেন্ডেন্স কালে নিয়ে গিয়ে পুরোনো দৃশ্য দেখানো দারুণ উপভোগ্য এবং গল্পের সাথে খাপ খাইয়ে তৈরী। অভীক মুখোপাধ্যায় ভালোই লিখেছেন তার অংশ। মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য-র অংশটা খুবই ভালো লেগেছে আমার। লেখার বাঁধন সুন্দর হবার সাথে সাথেই অংশটি তথ্যবহুলও। পরিবেশ ও ইতিহাসের বেশ কিছু সুন্দর তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে এটি। সাগরিকা রায়-এর অংশে সম্পূর্ণ গল্পটা একলাফে ২বছর এগিয়ে যায়। সুন্দর ভাবে পূর্বের সুতোগুলো টেনে একত্রে জোড়া হয়েছে। উত্তেজনাময় অংশ। তবে, গল্পের ভিতর গল্প, তার ভিতর গল্প, আবার তার ভিতর গল্প – অনেক সময় মূল গল্পের আমেজটাকে আহত করে। এখানেও অনেকটা সেরকম। দীপান্বিতা রায় আগের গল্পের সাথে মিলিয়ে লেখার চেষ্টা ভালোই করেছেন । অভীক সরকার নিজের অংশটুকু ভালোই লিখেছেন। পুরো জমজমাট। দেবারতি মুখোপাধ্যায় নিজের অংশটুকু ভালোই লিখছিলেন। কিন্তু হটাৎ করেই গল্পের মোড় ঘুরে তাতে অন্য মাত্রা চলে আসে। ‘প্রী-ইন্ডিপেন্ডেন্স এরা’, ‘সত্তরের দশক’, ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’, ‘নক্সাল আন্দোলন’ এবং তার সাথে সাথে একই ব্যক্তির উপর বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের চেপে বসা – আমার কাছে একটু গুরুপাচ্য মনে হল। অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী-র অংশে গল্প আবার ১ বছর এগিয়ে যায়। আগের অংশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে তাঁর গল্প এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা খুবই ভালো। হিমাদ্রীকিশোর দাশগুপ্ত-র উপর ছিল গুরু-দায়িত্ব। কারণ, এটিই উপন্যাসের একেবারে শেষ অংশ। পূর্বতন সমস্ত (১৫ জন) লেখকদের সকল ছেঁড়া সুতো এক জায়গায় এনে বাঁধা অবশ্যই একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। যদিও উনি আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন, এবং উনি এই গুরু-দায়িত্ব নিতে সক্ষম বলেই হয়ত ওনাকে একদম শেষ অংশের লেখা দেওয়া হয়েছিল। তবে, এই জায়গায় আমি কিছুটা নিরাশ হয়েছি। আরেকটু বেশি কিছু আশা করেছিলাম। এবং হয়ত এখানে জন্মান্তরবাদ-টা না আনলেই ভালো হত, পুরোনো আত্মার নতুন শরীরে ভর করাই যথেষ্ট ছিল বলে মনে হয়।

১৬ জনের ব্রেইন চাইল্ড এই উপন্যাস। সুতরাং গল্পের বহু জায়গায় সামঞ্জস্যতা না থাকাই স্বাভাবিক। এটিও ব্যতিক্রম নয় । বিভিন্ন জায়গায় প্লট হোল / লুপ হোল আছে। বেশ কিছু লেখক সেগুলিকে সুন্দরভাবে ম্যানেজ করারও চেষ্টা করেছেন। তবুও কিছু জায়গায় খামতি রয়েই গেছে। পুরো গল্পটা খুবই সুন্দর, তবে আরো ভালো হতে পারত। সম্পাদনা আরো কড়াভাবে করতে হত। তবুও বলব – এটা একটা অনন্য প্রচেষ্টা, সবাই মিলে উদ্যোগ নিয়ে রূপদান করেছেন, তার জন্য স্যালুট সকলকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s